বুয়েট থেকে পাস করা ইঞ্জিনিয়ার কিংবা মেডিকেল থেকে পাস করা ডাক্তার কিংবা কোন বিজ্ঞানী বা কৃষিবিদের বদলে সাধারন জ্ঞান মুখস্থ করে বিসিএস ক্যাডার হওয়া আমলার দাম যে রাষ্ট্রে বেশি সেখানে মেধাবীরা সবাই নিজ নিজ পেশা ছেড়ে অামলা হওয়ার চেষ্টা করবে সেটাই তো স্বাভাবিক।
তার আগে বলে নেই কোন বিশেষ বিষয়ের প্রতি আমার বিদ্বেষ নেই। কিন্তু কেউ স্বীকার করুন বা নাই করুক এই দেশে এখনো স্কুলের সবচেয়ে মেধাবী ছেলেমেয়েরাই বিজ্ঞান বিভাগে পড়ে। এরপর তাদের মধ্য থেকে অারও মেধাবীরা বুয়েট মেডিকেলে যায়। সেই তুলনায় পরের সারির ছেলেটা মানবিকে বা কমার্সে পড়ে। এদের মধ্যে মেধাবীরা অাবার অাইন, অর্থনীতির মতো বিষয়গুলাতে পড়ে। অথচ চাকুরির বাজারে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অর্থনীতিবিদ, বিবিএ কোনটাই গুরুত্বপূর্ণ নয়। এখানে যার যে বিষয়ই থাকুক না কেন আমলার দামই সবচেয়ে বেশি।
আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখেছি কলা বা সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের যে ছেলেমেয়েগুলো কাঙ্খিত বিষয়ে ভর্তি হতে পারতো না তারা প্রথম বর্ষ থেকেই বিসিএসের গাইড মুখস্থ করতে শুরু করেছে। একেবারেই উল্টোচিত্র ডাক্তার, ইঞ্জনিয়ার, কিংবা কৃষি বা বিজ্ঞানে পড়া ছেলেমেয়েদের ক্ষেত্রে। একই অবস্থা ব্যবসা প্রশাসন বা অর্থনীতি কিংবা ভালো কোন বিষয়ে পড়া ছেলেমেয়েদেরও।
চার পাঁচ বছর ধরে নিজের লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকা এই ছেলেমেয়েরা হঠাৎ করে চাকুরির পরীক্ষা দিতে এসে সাধারণ জ্ঞান নিয়ে হাবুডুব খেতে শুরু করে। তারা দেখে এতো কষ্ট করে পদার্থবিদ্যা বা গনিত পড়লেও চাকুরির বাজারে তার কদর নেই। ফলে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার সবাই গাইড কিনে পড়া শুরু করে।
এরপর? অনেক কষ্ট করে যেই ছেলেটি বিসিএসে স্বাস্থ্য, কৃষি কিংবা প্রকৌশলী ক্যাডারে নিয়োগ পেলো কিংবা কলেজের শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নিলো কিছুদিন পরেই তিনি বুঝতে পারেন ক্লাসের পেছনের সারির সেই ছেলেটি আজ তার বস হয়ে গেছে। কারণ তিনি প্রশাসনের কর্মকর্তা। নানা বৈষম্য অার না পেতে পেতে তার মধ্যে হতাশা বাড়ে।
সিরাজগঞ্জের একজন কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল একবার। তিনি একযুগেরও বেশি সময় ধরে কৃষি কর্মকর্তা। বহুকষ্টে মোটরসাইকেলে চড়ে আমার সঙ্গে একটা নিউজের বিষয়ে কথা বলতে স্পটে এসেছিলেন। নানা বিষয়ে তাঁর গবেষণা।ফসলের কীটপতঙ্গ নিয়ে তিনি কাজ করছেন। তার সেই কাজ দেখতে জাপান থেকে লোকজন এসেছে। তারা তাকে জাপানেও নিয়ে যেতে চায়। সেই কর্মকর্তা আফসোস করে জানালেন, চোখের সামনে কতো জুনিয়র এসে ইউএনও থেকে ডিসি হয়ে চলে গেছে। অথচ তিনি একই দশায়।
আফসোস করে তিনি বললেন, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে প্রথমবার কৃষি ক্যাডার পাবার পর দ্বিতীয়বার তিনি গিয়েছিলেন প্রশাসন ক্যাডারের চাকুরির জন্য। ভাইভা বোর্ডে ইয়াজউদ্দিন স্যার তাকে বলে, বাবা তুমি কৃষিতে পড়েছো। কৃষি ক্যাডারেই থাকো। কৃষকের জন্য কিছু করো। এরপর ভাইভা না নিয়েই তাকে পাঠিয়ে দেন। এখন তাঁর মাঝে মাঝেই সরকারি চাকুরি নিয়ে আফসোস লাগে। তারপরেও ভালোবসে নিজের কাজটা করেন।
অামি অনেক ডাক্তারকে বলতে শুনেছি, আমাদের আমলাতন্ত্রে ৭ম বিসিএসের একজন সিভিলসার্জনকে তার সন্তানের বয়সী সাধারন বিষয়ে পাস করে আসা ৩৩ বিসিএসের একজন ম্যাজিস্ট্রেট যখন 'সিএস সাহেব' বলে সম্মোধন করেন তখন তার প্রচণ্ড মন খারাপ হয়। আবার পরীক্ষার হলে সরকারী কলেজের সিনিয়র এসিস্ট্যান্ট প্রফেসরকেও প্রশাসন ক্যাডারে সদ্য নাম লেখানো ম্যাজিস্ট্রেট 'অমুক সাহেব' বলে সম্মোধন' করবেন এটাই যেন খুব স্বাভাবিক।
আমার কথায় আমলাতন্ত্রের শীর্ষ পদের অনেকেই মন খারাপ করতে পারেন তবুও বলছি আমাদের দেশের রাজনীতি তো নষ্ট। আমরা অনেক কিছুর জন্যই তাই রাজনীতিবিদদের দায়ী করি। কিন্তু নোংরা রাজনীতির পাশাপাশি বাংলাদেশের অনিয়ম দুর্নীতি আর পিছিয়ে থাকার একটা বড় কারন এই কেরানিতন্ত্র যাকে আপনারা বলেন আমলাতন্ত্র। জঘন্য মুখস্থ বিদ্যার বিসিএস আর কোটাতন্ত্র এই আমলাতন্ত্রের আরো ১২ টা বাজিয়েছে। বিসিএস দিয়ে মেধা তালিকার ৫০০ এর মধ্যে থেকেও চাকুরি পাবে না, আবার কোটার কারণে দুই হাজারতম হয়েও চাকুরির ব্যাবস্থা আমাদের পুরো আমলাতন্ত্রের মান নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে। পাশাপাশি সিস্টেমে সমস্যা, অনিয়ম, দুর্নীতি, দলবাজি তো অাছেই।
আমি বলছি না প্রশাসনে সৎ মেধাবী লোক নেই, অবশ্যই আছে, কিন্ত ম্যাজিষ্ট্রেট মুনীর চৌধুরী একজনই। আমার কাছে মনে হয় আমাদের টোটাল আমলাতন্ত্রটাই মানুষকে কষ্ট দেয়ার তন্ত্র। ব্রিটিশরা কেরানি বানানোর জন্য যে সিস্টেম এখানে চালু করেছিল আজো সেটি বহাল তবিয়তে টিকে আছে। সচিবদের কথা বাদ দিলাম এই দেশে অনেক সরকারি অফিসের নিম্নপদের কেরানিরও তাই লাখ–কোটি টাকা আছে। কারণ ওই কেরানিতন্ত্র।
এদেশে যারা সৎ বা ভালো থাকতে চায় তাদের একটা বড় অংশই লেখাপড়া শেষে বুঝতে পারে বাংলাদেশের চাকুরির বাজারটা তাদের জন্য নয়। তাই যারা পারে দেশ ছাড়ে। আর গনিত কিংবা পদার্থবিজ্ঞান পড়া ছেলেটা কিছু করতে না পেরে কেরানি কিংবা ব্যাংকের টাকা গোনার চাকুরির জন্য লড়াইয়ে নামে। অামলা হতে চায়। কিন্তু সবাই তো অামলা হয় না। কারও কারও শুধুই কামলাগিরি করতে হয়।
অাপনি বিচারক হন কিংবা বিজ্ঞানী আমাদের আমলাতন্ত্রে প্রশাসন ক্যাডারেরই সব ক্ষমতা। এই আমলাতন্ত্র এতোটাই শক্তিশালী যে আরবি থেকে পাস করা লোক এখানে কৃষি কিংবা স্বাস্থ্য সচিব বনে যান। অার বাকিরা বঞ্চিত। আমি কোনভাবেই বুঝি না কৃষি ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা কেন কৃষি সচিব হবেন না? কেন স্বাস্থ্য ক্যাডারের বদলে ইংরেজি পড়া ছেলেটিকেই স্বাস্থ্যসসচিব হতে হবে। কেন একজন শিক্ষক শিক্ষাসচিব হবেন না? কেন অামলাদেরই সব হতে হবে!
অনেকেই বলতে পারেন কোন সাবজেক্টে পড়েছে সরকারি চাকুরিতে সেটা বিষয় নয়। চাকুরি করতে করতে তিনি আসলে যোগ্য হয়ে যান। হতে পারে। সেক্ষেত্রে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এতো বিষয়ের এতো সীট না রেখে উচ্চমাধ্যমিক পাস করিয়ে যথাযথভাবে চাকুরির প্রশিক্ষণ দিলেই হয়। সেনাবাহিনী যেমন উচ্চমাধ্যমিক পাস করা ছেলেমেয়েদর প্রশিক্ষণ দিয়ে অফিসার বানায় অামরাও তাই করি। খামাকা পদার্থ গনিত ডাক্তারি পড়িয়ে লাভ কী? কারণ সেই তো অনার্স–মাষ্টার্স পাস করে একটা চাকুরি পাবার জন্য ছেলেমেয়েদের সেই ভয়ঙ্কর লড়াইয়েই নামতে হবে।
অার চাকুরি পেলেই লড়াই শেষ নয়। শিক্ষক ভাবে তিনি কেন এতো অবহেলার শিকার? ডাক্তার ও প্রকোশলীও তাই। পুলিশ ভাবে প্রশাসন কেন সব পাবে? প্রশাসন ভাবে পুলিশ কেন? অন্যরা তখন হতাশায় নিমজ্জিত। অান্তঃক্যাডার বৈষম্যে এভাবে বাকিরা যায় হারিয়ে। এরপর শুরু হয় নিজ ক্যাডারে উপরে ওঠার লড়াই। তেলবাজি, দলবাজি।
যারা আমাদের এই কেরানিতন্ত্রের পক্ষে যুক্তি দেবেন তারা একটু বলেন তো আমাদের সরকারি অফিসগুলোর মান কী কমছে না বাড়ছে? সাধারণ জনগন ভূমি অফিসকে কী মনে করে? অামি তো বলবো এসব জায়গা দিনকে দিন খারাপ হচ্ছে।
আমি তো মনে করি বাংলাদেশের আজকের অগ্রগতির পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান কৃষকের, কৃষি কর্মকর্তার। এরপর ব্যাবসায়ী, গার্মেন্টস শ্রমিক, স্বল্পশিক্ষিত প্রবাসী আর বিশাল বেসরকারি খাত। সেখানে আমলাতন্ত্রের ভূমিকা কী খুব বেশি?
খুব অবাক হই আমাদের আমলারা যখন অবসরে গিয়ে টেলিভিশন বা পত্রিকায় সংস্কারের কথা বলেন। আচ্ছা চাকুরি জীবনে কী এসব বুদ্ধি আপনাদের মাথায় আসে না? অবসরে গিয়ে যে সচিব কোটা সংস্কারের কথা বলেন চাকুরিজীবনে তিনি হয়তো তার পক্ষে একটা নোটশিটও লেখেননি।
অবশ্য ৯০ এর পরে আমাদের আমলাতন্ত্র এখন এতোটাই বিভক্ত যে তারা সিদ্ধান্ত নেন দল চিনে। এখানে কর্মকর্তাদের মানের চেয়ে দলীয় যোগ্যতাই বেশি দেখা হয়। কাজেই তারা কতোটা ভূমিকা রাখতে পারেন সেটাও প্রশ্ন।
কেউ কেউ ভাবতে পারেন হঠাৎ করে কেন এতো কথা বলছি। সরকারি চাকুরি করা এক প্রকোশলী নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে হতাশ হয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছে। সেটা দেখেই কথাগুলো মনে এলো। বেতন কাঠামো নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক খুব ভালো উদাহরণ দিয়েছেন। তার মতে মাত্রাতিরিক্ত বেতন বাড়িয়ে এতো বেশি অপমান কেউ করেনি।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের কথা না হয় বাদ দিলাম তারা অনেক সুবিধা পান। কিন্তু এই দেশে যারা সত্যিকারের মানুষ গড়ার কারিগর সেই স্কুল শিক্ষকেরা কিন্তু সরকারি অফিসের অনেক পিয়নের চেয়ে কম বেতন পান। কাজেই ডাক্তার-ইঞ্জনিয়ার-শিক্ষক সব বাদ দিয়ে দেশের তরুণরা সবাই একদিন কেরানি হতে চাইবে এই দেশে সেটাই স্বাভাবিক।
অনেকে অনেক কিছু বলতে পারেন। তর্ক বিতর্ক করতে পারেন। আমি কাউকে অসম্মান করছি না। কাউকে কষ্ট দিতে চাচ্ছি না। বরং বিষয়টা নিয়ে আলোচনা হোক। সংস্কার হোন। কারণ এই দেশের ডাক্তার–ইঞ্জিনিয়ার–আমলা সবাই আমাদেরই ভাইবোন।
আমি কিন্তু দেখতে পাচ্ছি এই দেশের তরুণদের একটা বড় অংশই তাদের মেধা–যোগ্যতা শেষ করে ফেলছে একটা সরকারি চাকুরির পেছনে। ডাক্তার-ইঞ্জনিয়ার-শিক্ষক সব বাদ দিয়ে দেশের তরুণরা সবাই এখন প্রশাসন কাডারে যোগ দেয়ার স্বপ্ন দেখছে। আর মেধাবিদের আরেকটা বড় অংশ দেশ ছেড়ে যাচ্ছে বিশেষ করে বিজ্ঞানে পড়া। আর যারা থাকছে তারা বিসিএস প্রকৌশলী, কৃষি বা স্বাস্থ্য ক্যাডারের কর্মকর্তা হয়ে আজীবন ছোট হয়ে থাকছে। অথচ উচিত ছিল এমন ব্যবস্থা যেখানে কোন বৈষম্য থাকবে না।
সব দেখে বলতেই হয় বড়ই আজব বাংলাদেশের শিক্ষাব্যাবস্থা আর অামলা বানানের কৌশল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের পাবলিক লাইব্রেরীগুলোতে এখন যান দেখবেন জ্ঞান চর্চার বদলে সবাই সাধারণ জ্ঞান মুখস্থ করছে। কারণ এইদেশে এখানে সবার স্বপ্ন অামলা হওয়া। কী ডাক্তার কী প্রকৌশলী কী সাধারণ কী অসাধারণ সবাই প্রশাসন বা পুলিশ হওয়ার ক্যাডারে যোগ দেয়ার স্বপ্নে বিভোর। সমস্যার সমাধান না হলে অামাদের শিক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি যে ধ্বংস হবে তাই নয়, অামাদের তারুণ্যের সব স্বপ্ন হারিয়ে যাবে। শুধু জয় হবে বিসিএসতন্ত্রের।
© সাংবাদিক শরিফুল হাসান
0 Comments